মাছের মতো দেখতে যন্ত্র যে জল বাঁচাবে
জলে সাঁতার কাটছে একটি মাছ। দেখতে একেবারে জীবন্ত, লেজ নাড়ে, দেহ বাঁকায়, জলের স্রোতের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। কিন্তু একটু ভালো করে তাকালেই বোঝা যাবে—এ মাছ প্রকৃতির সৃষ্টি নয়। এর শরীর রক্ত-মাংসের নয়, ধাতু ও যন্ত্রাংশে তৈরি। তবুও এই কৃত্রিম মাছই ভবিষ্যতে জলকে বাঁচাতে পারে এক নীরব ঘাতকের হাত থেকে। সেই ঘাতকের নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক।
ইংল্যান্ডের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক ছাত্র তৈরি করেছেন এই অভিনব যন্ত্র-মাছ। নাম দেওয়া হয়েছে ‘গিলবার্ট’। উদ্দেশ্য একটাই—জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়া অদৃশ্য প্লাস্টিক কণাকে গিলে নিয়ে জলকে পরিশুদ্ধ করা। পরিবেশ দূষণ রোধে প্রযুক্তির এমন ব্যবহার ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সময়ে প্লাস্টিক দূষণ শুধু দৃশ্যমান বোতল, ব্যাগ বা প্যাকেটেই সীমাবদ্ধ নয়। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্লাস্টিকের এই অতি ক্ষুদ্র কণাগুলির ব্যাস সর্বোচ্চ ৫ মিলিমিটার বা ০.২ ইঞ্চির বেশি নয়। আকারে এতটাই ছোট যে খালি চোখে বেশিরভাগ সময়ই ধরা পড়ে না। নদী, পুকুর, হ্রদ এমনকি পানীয় জলেও নীরবে মিশে থাকে এই কণা।
মানুষ যখন জল পান করে, তখন অজান্তেই এই মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই কণাগুলি মানবদেহে ঢুকে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু মানুষ নয়, জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই দূষণের ফলে।

এই সমস্যার সমাধান খুঁজতেই জন্ম গিলবার্টের। যন্ত্র হলেও গিলবার্টের শরীরের গঠন অনেকটাই মাছের মতো। এর মাথা, দেহ ও লেজ এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে এটি স্বাভাবিক মাছের মতোই জলে সাঁতার কাটতে পারে। জলের মধ্যে চলাফেরার সময় এটি আশপাশের জল নিজের শরীরের ভিতর টেনে নেয়।
বিশ্বের দ্রুততম গাড়ির বৈশিষ্ট্য
গিলবার্টের আসল কৌশল লুকিয়ে আছে তার যান্ত্রিক ‘কানকো’ বা গিলের মধ্যে। ঠিক মাছ যেমন শ্বাস নেওয়ার সময় জল ছেঁকে অক্সিজেন গ্রহণ করে, তেমনই গিলবার্ট জল ছেঁকে মাইক্রোপ্লাস্টিক আলাদা করে ফেলে। এর ভিতরে থাকা বিশেষ ছাঁকনি বা ফিল্টার এতটাই সূক্ষ্ম যে মানুষের চোখে ধরা না-পড়া প্লাস্টিক কণাও এতে আটকে যায়। পরিশুদ্ধ জল আবার শরীরের পিছন দিক দিয়ে বেরিয়ে আসে।
এই রোবট মাছ কোনও রাসায়নিক ব্যবহার করে না, ফলে জলদূষণের নতুন কোনও ঝুঁকি তৈরি হয় না। এটি সম্পূর্ণ যান্ত্রিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে কাজ করে। গবেষকের দাবি, ভবিষ্যতে বড় আকারে এমন যন্ত্র-মাছ ব্যবহার করা গেলে নদী ও হ্রদের জল অনেকটাই মাইক্রোপ্লাস্টিক মুক্ত করা সম্ভব হবে।
গিলবার্ট শুধু পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ নেই। সম্প্রতি রোবটদের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল এই যন্ত্র-মাছ। সেখানে নানা ধরনের অত্যাধুনিক রোবট অংশ নিয়েছিল, কিন্তু সবার নজর কেড়ে নেয় গিলবার্টই। কার্যকারিতা, নকশা ও পরিবেশবান্ধব চিন্তাধারার জন্য প্রতিযোগিতায় সেরার শিরোপা জিতে নেয় এই রোবট মাছ।
সেরা ফ্রি ব্রাউজার গেম ওয়েবসাইট তালিকা
এই সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে, পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ে প্রযুক্তি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। যেখানে মানুষ বা প্রচলিত যন্ত্র পৌঁছাতে পারে না, সেখানে এমন স্বয়ংক্রিয় রোবট কাজ করতে পারে দিনের পর দিন। নদীর গভীর অংশ, হ্রদের দুর্গম কোণ কিংবা শিল্পাঞ্চলের দূষিত জলাশয়—সব জায়গাতেই গিলবার্টের মতো যন্ত্র-মাছ ভবিষ্যতে নিয়মিত কাজ করতে পারে।
গবেষক ছাত্রের লক্ষ্য এখানেই শেষ নয়। তিনি চান গিলবার্টের পরবর্তী সংস্করণ আরও বেশি দক্ষ হোক, বেশি পরিমাণ জল পরিশোধন করতে পারুক এবং দীর্ঘ সময় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই কাজ করতে সক্ষম হোক। পাশাপাশি একাধিক রোবট মাছ একসঙ্গে কাজ করে বড় জলাশয় পরিষ্কার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকৃতি আজ যে সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে, তার সমাধান শুধুমাত্র সচেতনতা নয়, চাই বাস্তব প্রযুক্তিগত উদ্যোগ। গিলবার্ট সেই উদ্যোগেরই একটি উদাহরণ। জীবন্ত মাছ না হয়েও, এই যন্ত্র-মাছ হয়তো একদিন সত্যিকারের জলরক্ষী হিসেবে পরিচিত হবে। মানুষের তৈরি হলেও, প্রকৃতির সুরক্ষায় তার ভূমিকা হতে পারে অতুলনীয়।
মাছের মতো দেখতে যন্ত্র যে জল বাঁচাবে মাছের মতো দেখতে যন্ত্র যে জল বাঁচাবে মাছের মতো দেখতে যন্ত্র যে জল বাঁচাবে
জলে সাঁতার কাটে, মাছের মতোই দেখতে—কিন্তু এটি জীবন্ত নয়।
ইংল্যান্ডের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক ছাত্র তৈরি করেছেন ‘গিলবার্ট’ নামের এক যন্ত্র-মাছ, যা জল থেকে অদৃশ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক ছেঁকে ফেলতে সক্ষম।
পরিবেশ রক্ষায় প্রযুক্তির এমন উদ্ভাবন ভবিষ্যতে পানীয় জল সুরক্ষায় বড় ভূমিকা নিতে পারে।
জানুন কীভাবে এই রোবট মাছ প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
