মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই?
মিয়ানমারে চলমান তিন ধাপের সাধারণ নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্ব শেষ হওয়ার পর দেশটির সামরিক বাহিনী-সমর্থিত রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (USDP) আরও এগিয়ে গেছে। দেশটির নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল USDP-এর পক্ষে যাচ্ছে, যা দেশটিকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশজুড়ে সশস্ত্র সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম আকার ধারণ করেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ মিলিয়ে USDP প্রায় ১৮২টি আসনে জয় পেতে যাচ্ছে। মিয়ানমারের নিম্নকক্ষ সংসদে মোট আসন সংখ্যা ৩৩০টি, যার অর্ধেকেরও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে দলটি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এমআরটিভি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপের ভোটে USDP ১০০টির মধ্যে ৮৬টি আসনে জয় লাভ করেছে। এই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় গত রবিবার। তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট নির্ধারিত রয়েছে ২৫ জানুয়ারি।
তবে এই নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক চলছে। মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, এই নির্বাচন মোটেই স্বাধীন বা সুষ্ঠু নয়। তাদের অভিযোগ, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনী যে অভ্যুত্থান ঘটায়, তার বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।
যে সব মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার হুমকি
সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারে ব্যাপক গণবিরোধিতা শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে রূপ নেয় পূর্ণমাত্রার গৃহযুদ্ধে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। এই কারণেই নির্বাচন তিন ধাপে আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণ হয়েছে দেশের মোট ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২০২টিতে। প্রথম ধাপ অনুষ্ঠিত হয় ২৮ ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় ধাপ ১১ জানুয়ারি। তবে তৃতীয় ধাপে আরও কিছু টাউনশিপে ভোট হলেও অন্তত ৬৫টি এলাকা সম্পূর্ণভাবে নির্বাচনের বাইরে থাকছে, কারণ সেখানে তীব্র যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

চূড়ান্তভাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক আইনসভার সব আসনের ফলাফল জানুয়ারির শেষ নাগাদ প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল জ’ মিন তুন জানিয়েছেন, আগামী মার্চ মাসে সংসদের দুই কক্ষ বসবে এবং এপ্রিল থেকে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
সামরিক সরকারের দাবি অনুযায়ী, প্রথম দুই ধাপের ভোটগ্রহণ চলাকালে সেনাবাহিনীর বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বহু জায়গায় ভোটকেন্দ্র ও সরকারি ভবনে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনার কারণে ভোটার উপস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)-এ চলমান একটি মামলার কারণে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেছে, যার শুনানি বর্তমানে চলছে। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিয়ানমারের ভাবমূর্তিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এবারের নির্বাচনে জাতীয় ও আঞ্চলিক সংসদের জন্য ৫৭টি রাজনৈতিক দলের ৪,৮০০-এর বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে এর মধ্যে মাত্র ছয়টি দল সারা দেশে প্রার্থী দিয়েছে। বিরোধী রাজনীতির পরিসর যে কতটা সীমিত হয়ে এসেছে, এটি তারই একটি বড় উদাহরণ।
নতুন জোট সৌদি পাকিস্তান তুরস্ক
এই ছয়টি দলের একটি হলো পিপলস পাইওনিয়ার পার্টি। তবে দলটি বর্তমানে আইনি ঝুঁকিতে রয়েছে। দলের চেয়ারপারসন থেট থেট খাইন এবং আরেকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়া ইয়াঙ্গুনে একটি বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এই ঘটনার জেরে দলটির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দল ভেঙে দেওয়ার পথ তৈরি করতে পারে।
এর পাশাপাশি নতুন করে প্রণীত নির্বাচন সুরক্ষা আইন পরিস্থিতিকে আরও কঠোর করেছে। এই আইনের আওতায় নির্বাচনের সমালোচনা করা হলে কঠিন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সম্প্রতি লিফলেট বিতরণ বা অনলাইন পোস্টের অভিযোগে ৩৩০-এর বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, মিয়ানমারের চলমান নির্বাচন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সংকট, সামরিক শাসন, গৃহযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক চাপের প্রতিফলন। চূড়ান্ত ফলাফল যাই হোক না কেন, এই নির্বাচন যে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, তা বলাই বাহুল্য।
মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই? মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই? মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই? মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই? মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই? মিয়ানমারে নির্বাচন নাকি বৈধতার লড়াই?
