রাশিয়ান ক্রেতা চাপে ফেলতে মার্কিন বিল

রাশিয়ান ক্রেতা চাপে ফেলতে মার্কিন বিল

রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে লক্ষ্য করে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। প্রস্তাবিত নতুন এই বিলে ভারত, চীন ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলো সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্য লিন্ডসে গ্রাহাম এক বিবৃতিতে জানান, রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মস্কোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানো।

কী আছে প্রস্তাবিত বিলে

‘গ্রাহাম-ব্লুমেন্টাল নিষেধাজ্ঞা বিল’ নামে পরিচিত এই বিলটি যৌথভাবে উত্থাপন করেছেন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ও রিচার্ড ব্লুমেনথাল। বিলটি পাস হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সরাসরি সেই সব দেশের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবেন, যারা জেনেশুনে রাশিয়ার তেল, গ্যাস, ইউরেনিয়াম বা অন্যান্য কৌশলগত পণ্য কিনছে।

বিল অনুযায়ী, এসব দেশের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হলে তার ওপর কমপক্ষে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যাবে। একই সঙ্গে আরোপ করা হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা, যা বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

মার্কিন কংগ্রেস

ভারত, চীন ও ব্রাজিলের ওপর নজর

লিন্ডসে গ্রাহামের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাশিয়া থেকে নিয়মিত ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জ্বালানি কেনা দেশগুলোর মধ্যে ভারত, চীন ও ব্রাজিল অন্যতম। এই তিন দেশই বর্তমানে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বড় ক্রেতা।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও ব্রাজিলের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ এবং চীনের পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। নতুন বিল কার্যকর হলে এই শুল্কের হার কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ট্রাম্পের সমর্থনের দাবি

বিবৃতিতে সিনেটর গ্রাহাম জানান, বুধবার তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে এই নিষেধাজ্ঞা বিল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গ্রাহামের দাবি, ট্রাম্প এই বিলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

গ্রাহাম বলেন, “এই বিলটি সঠিক সময়ে আনা হয়েছে। ইউক্রেন শান্তির জন্য বিভিন্ন ছাড় দিচ্ছে, অথচ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন কেবল কথার আশ্বাস দিচ্ছেন। বাস্তবে রাশিয়ার সেনারা এখনও নিরীহ মানুষের প্রাণ নিচ্ছে।”

রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার লক্ষ্য

এই বিলের মূল উদ্দেশ্য শুধু রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা নয়, বরং তার অর্থনীতিকে কার্যত পঙ্গু করে দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, রাশিয়ার রাজস্বের একটি বড় অংশ আসে তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে। সেই উৎস বন্ধ বা সীমিত করতে পারলে ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই কমে যাবে।

বিল অনুযায়ী, যেসব দেশ রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও কৌশলগত পণ্যের বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ কার্যত কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ওই দেশগুলোর ওপরও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।

মাদুরো ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দ্বন্দে

আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই বিলটি প্রথমে যাবে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে। সেখানে পাস হলে বিলটি যাবে উচ্চকক্ষ সিনেটে। সিনেটের অনুমোদন পাওয়ার পর বিলটি প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হবে।

প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের মাধ্যমেই এটি আইনে পরিণত হবে। লিন্ডসে গ্রাহাম জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহেই এই বিলের ওপর কংগ্রেসে ভোটগ্রহণ শুরু হতে পারে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিল কার্যকর হলে শুধু রাশিয়া নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত, চীন ও ব্রাজিলের মতো বড় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা বলছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষার জন্য এই কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজনীয়।

সব মিলিয়ে, রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্য ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভেনেজুয়েলায় অভিযান বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়া

রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা বিল আনছে যুক্তরাষ্ট্র। বিলটি পাস হলে ভারত, চীন ও ব্রাজিল বড় অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে। এই বিল পাস হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

Leave a Comment