মেসি কোচ নয় মালিক হিসেবে থাকতে চান

মেসি কোচ নয় মালিক হিসেবে থাকতে চান

ফুটবল মানেই লিওনেল মেসি—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে গত দুই দশকে। মাঠে তার জাদুকরী স্পর্শ, চোখ ধাঁধানো ড্রিবল আর অবিশ্বাস্য গোল বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু এই আলোঝলমলে অধ্যায় একদিন শেষ হবেই। তখন লিওনেল মেসি নিজেকে কোথায় দেখতে চান—এই প্রশ্ন ফুটবলপ্রেমীদের মনে বহুদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল। অবশেষে সেই কৌতূহলের জবাব দিলেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক নিজেই।

সম্প্রতি আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম Luzu-কে দেওয়া এক দীর্ঘ ও খোলামেলা সাক্ষাৎকারে মেসি জানিয়েছেন, অবসরের পর মেসি কোচ নয় মালিক হিসেবে থাকতে চান। এমনকি জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার কোনো আগ্রহও নেই তার। অর্থাৎ, দিয়েগো ম্যারাডোনার মতো আর্জেন্টিনা দলের কোচ হওয়ার ভাবনাকে কার্যত নাকচ করে দিয়েছেন এই মহাতারকা।

কোচিং নয়, সিদ্ধান্তের জায়গায় থাকতে চান

সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, অবসরের পরও ফুটবলের সঙ্গেই থাকতে চান তিনি, তবে ভিন্ন ভূমিকায়। তার ভাষায়, তিনি চান নিচ থেকে শুরু করে নিজের একটি ক্লাব গড়ে তুলতে। যেখানে তরুণ ফুটবলাররা সুযোগ পাবে, নিজেদের তৈরি করার সময় পাবে এবং ধীরে ধীরে সেই ক্লাবটি একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

মেসির এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট—তিনি মাঠের বাইরে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে নির্দেশনা দেওয়ার চেয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকতে বেশি আগ্রহী। একজন কোচের চেয়ে একজন মালিক বা পরিচালকের ভূমিকাই তার কাছে বেশি আকর্ষণীয়। ফুটবলকে তিনি দেখতে চান দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দৃষ্টিতে, যেখানে অবকাঠামো, যুব উন্নয়ন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনাই হবে মূল চাবিকাঠি।

IPL থেকে বাদ: কী বলছে বিমা নীতি

ম্যারাডোনার পথ অনুসরণ নয়

আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনা যেমন একজন খেলোয়াড় হিসেবে কিংবদন্তি ছিলেন, তেমনি জাতীয় দলের কোচ হিসেবেও তিনি একটি অধ্যায় রচনা করেছিলেন। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, মেসিও একদিন সেই পথেই হাঁটবেন। কিন্তু মেসি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, এই পথে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।

তার মতে, কোচিং এমন একটি পেশা যেখানে সারাক্ষণ চাপ, সমালোচনা আর দায়িত্বের বোঝা থাকে। খেলোয়াড় জীবনে তিনি এসব সামলালেও অবসরের পর নিজের জীবনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে চান। পরিবার, ব্যক্তিগত সময় এবং নিজের পছন্দের কাজে যুক্ত থাকার দিকেই তার ঝোঁক বেশি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই

মেসির এই বক্তব্য যে কেবল কথার কথা নয়, তার প্রমাণ ইতোমধ্যেই মিলেছে। জানা গেছে, উরুগুয়েতে লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে যৌথভাবে একটি ফুটবল ক্লাব প্রকল্পে যুক্ত আছেন তিনি। এই উদ্যোগকে অনেকে মেসির অবসর-পরবর্তী জীবনের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রকল্পে যুক্ত হওয়া মানে মেসি ধীরে ধীরে ফুটবলের প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক দিকগুলো বুঝে নিচ্ছেন। ভবিষ্যতে তিনি হয়তো দক্ষিণ আমেরিকা কিংবা অন্য কোথাও একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লাব গড়ে তুলবেন, যেখানে তার ফুটবল দর্শনের প্রতিফলন দেখা যাবে।

বাংলাদেশের টি২০ বিশ্বকাপ স্কোয়াড চূড়ান্ত

শেষ বিশ্বকাপের স্বপ্ন এখনও জীবিত

বর্তমানে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন ৩৮ বছর বয়সী মেসি। ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে পৌঁছালেও তার লক্ষ্য এখনো স্পষ্ট—২০২৬ সালের বিশ্বকাপ। ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে বহুদিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। তবে সেই শিরোপা ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা এখনো তার মনে জ্বলজ্বল করছে।

মেসি জানেন, শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না। তবুও নিজেকে যতটা সম্ভব ফিট রেখে শেষ বিশ্বকাপে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তার মতে, মাঠের জীবন সীমিত হলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অকপট স্বীকারোক্তি

এই সাক্ষাৎকারে মেসি শুধু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই নয়, নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি স্বীকার করেন, বার্সেলোনায় খেলার সময় জীবনের এক পর্যায়ে তিনি মানসিকভাবে চাপে পড়েছিলেন এবং তখন থেরাপির সাহায্য নিয়েছিলেন।

মেসির ভাষায়, আগে তিনি সব কিছু নিজের ভেতর চেপে রাখতেন। সমস্যার কথা কাউকে বলতে চাইতেন না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বদলেছেন। এখন আর থেরাপি না করলেও নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শিখেছেন।

তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে একা থাকতে ভালো লাগে তার। নীরবতা ও নিরিবিলি সময় উপভোগ করেন। তবে সন্তানদের হাসি, দৌড়াদৌড়ি আর কোলাহলেও তিনি আনন্দ খুঁজে পান।

Lionel Messi Official

মাঠের নায়ক থেকে ভবিষ্যতের নির্মাতা

সব মিলিয়ে, লিওনেল মেসির বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—ফুটবল থেকে অবসর নিলেও তিনি খেলাটিকে ছেড়ে যাচ্ছেন না। শুধু ভূমিকা বদলাতে চান। মাঠের নায়ক হিসেবে যে অধ্যায় তিনি লিখেছেন, তা ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। আর অবসরের পর তিনি নিজেকে দেখতে চান ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার এক নীরব নির্মাতা হিসেবে।

মেসির এই ভাবনা প্রমাণ করে, তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে একজন সফল ক্লাব মালিক হিসেবেও হয়তো তাকে দেখা যাবে—যেখানে তার স্বপ্ন, দর্শন ও অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের পথ দেখাবে।

Leave a Comment