পশ্চিমা সেনা: নিরাপত্তা নাকি সংঘাত

পশ্চিমা সেনা: নিরাপত্তা নাকি সংঘাত

ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর রাশিয়া তাদের দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থান আরও জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে। মস্কো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—ইউক্রেনের ভূখণ্ডে পশ্চিমা দেশগুলোর যেকোনো সামরিক উপস্থিতিকে তারা “বিদেশি হস্তক্ষেপ” হিসেবে দেখবে এবং সেই বাহিনীকে “বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু” হিসেবে বিবেচনা করবে।

বৃহস্পতিবার রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ইউক্রেনের ভেতরে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক ইউনিট, সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রাগার কিংবা অন্য কোনো সামরিক অবকাঠামো মোতায়েন করা হলে সেটিকে সরাসরি বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। রাশিয়ার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

জাখারোভার এই মন্তব্য আসে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের সাম্প্রতিক একটি যৌথ উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে। মঙ্গলবার লন্ডনে অনুষ্ঠিত তথাকথিত “কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং”–এর বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একটি ‘ডিক্লারেশন অব ইনটেন্ট’ বা অভিপ্রায়পত্রে সই করেন। এতে বলা হয়, ভবিষ্যতে কোনো শান্তি চুক্তি কার্যকর হলে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বহুজাতিক সেনা মোতায়েন করা হতে পারে।

রাশিয়ান ক্রেতা চাপে ফেলতে মার্কিন বিল

রাশিয়া বরাবরই ইউক্রেনে পশ্চিমা সেনা উপস্থিতির বিরোধিতা করে আসছে। জাখারোভা বলেন, “এই ধরনের সতর্কবার্তা আমরা বহুবার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দিয়ে এসেছি এবং এখনো তা প্রাসঙ্গিক।” তিনি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের এই উদ্যোগকে একটি “নতুন সামরিকবাদী ঘোষণা” বলে আখ্যায়িত করেন, যা সংঘাত কমানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তার দাবি জানিয়ে আসছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া কোনো শান্তি চুক্তি টেকসই হবে না। এই প্রেক্ষাপটেই ইউক্রেন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত—সে বিষয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ধীরে ধীরে একটি কাঠামো স্পষ্ট হচ্ছে। মঙ্গলবারের ওই চুক্তিতে ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনাদের ইউক্রেনে কার্যক্রম চালানোর জন্য একটি আইনি কাঠামোর কথাও উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানান, এটি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সেনা মোতায়েনের পথ সুগম করবে।

বৃহস্পতিবার জেলেনস্কি বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা সংক্রান্ত চুক্তিটি এখন “মূলত চূড়ান্ত পর্যায়ে” রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চূড়ান্ত আলোচনার অপেক্ষায় আছে। এর আগে বুধবার ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত অতিরিক্ত আলোচনাতেও এই বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়।

তবে ইউক্রেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে কোনো সমঝোতায় পৌঁছালেও রাশিয়ার সর্বশেষ বক্তব্য স্পষ্ট করে দিয়েছে—দুই পক্ষের অবস্থান এখনো বহু দূরে। বরং সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে, যাতে শীতের চরম সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।

মাদুরো ইস্যু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি দ্বন্দে

কিয়েভ কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার নাগরিকদের পানি, ব্যাটারি ও উষ্ণ পোশাক মজুত করার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ, নতুন করে হামলার আশঙ্কা রয়েছে এবং তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। তীব্র শীতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার মঙ্গলবার মন্তব্য করেন, “শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে পুতিনকে আপস করতে প্রস্তুত হতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার বক্তব্য ও কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে না যে তিনি সত্যিকার অর্থে শান্তির পথে হাঁটতে আগ্রহী।”

সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে কূটনৈতিক উদ্যোগ ও সামরিক হুঁশিয়ারি একসঙ্গে চলছে। পশ্চিমা দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তার উদ্যোগ যেমন ইউক্রেনকে আশ্বস্ত করছে, তেমনি রাশিয়ার কঠোর অবস্থান যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক সমঝোতার ওপর।

পশ্চিমা সেনা: নিরাপত্তা নাকি সংঘাত পশ্চিমা সেনা: নিরাপত্তা নাকি সংঘাত পশ্চিমা সেনা: নিরাপত্তা নাকি সংঘাত

ইউক্রেনে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও রাশিয়া স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে—পশ্চিমা সেনা মোতায়েন হলে তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা হবে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কথা বলছে, আর রাশিয়া জোরালো অবস্থান নিচ্ছে। যুদ্ধের মাঝেই শান্তির আশার সঙ্গে বাড়ছে উত্তেজনা।

পশ্চিমা সেনা: নিরাপত্তা নাকি সংঘাত

Leave a Comment