ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ

ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ

দেশের শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। প্রায় ১৪ মাস ধরে জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে কোটি কোটি শিশু নিয়মিত এই গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকলে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি এবং সামগ্রিক পুষ্টি পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের সরবরাহ ঘাটতি এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত বছরের মার্চ মাসে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর দুইবার এই কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এরপর নির্ধারিত সময়ে আর কোনো ক্যাম্পেইন আয়োজন সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, চলতি মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় ক্যাপসুল দেশে পৌঁছাবে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তাহলে জুন মাসের শেষ সপ্তাহে পুনরায় কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। এটি শুধু দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করে না, বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দীর্ঘদিন ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা শিশুস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাংলাদেশে সাধারণত ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। ছয় থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের একটি নির্দিষ্ট মাত্রার নীল রঙের ক্যাপসুল এবং এক বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের লাল রঙের ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। প্রতি বছর গড়ে আড়াই কোটিরও বেশি শিশু এই কর্মসূচির সুবিধা পেয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ সময় ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকলে রাতকানা রোগের ঝুঁকি পুনরায় বাড়তে পারে। একসময় বাংলাদেশে রাতকানা ছিল একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ধারাবাহিকভাবে ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে এই রোগ প্রায় নির্মূল হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ ব্যাহত হলে সেই অর্জন হুমকির মুখে পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য গবেষণাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতিতে ভুগছে। অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত পুষ্টি না থাকায় শিশুদের শরীরে এই ভিটামিনের অভাব দেখা দেয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের ক্যাম্পেইনগুলো শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। এ কারণে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের হাম, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণজনিত রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া সংক্রমণে আক্রান্ত হলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সাহায্য করে। তাই শিশুদের নিয়মিত ভিটামিন ‘এ’ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূর্বে দরপত্রের মাধ্যমে ক্যাপসুল সংগ্রহ করা হলেও এবার ভিন্ন পদ্ধতিতে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কিছুটা সময় বেশি লেগেছে। এই প্রশাসনিক ও ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই মূলত ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভিটামিন ‘এ’ নয়, শিশুদের অন্যান্য অনুপুষ্টিকণার ঘাটতিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আয়রন, জিংক, আয়োডিন এবং ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবও শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। তাই পুষ্টি কর্মসূচিগুলো নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলের পাশাপাশি কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক সময় কৃমির কারণে শিশুদের শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। ফলে অপুষ্টির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তাই ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।

ভিটামিন ‘এ’ শিশুদের জন্য যেসব উপকার করে তার মধ্যে রয়েছে দৃষ্টিশক্তি উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শারীরিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা, সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো, ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষা এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়তা করা। এসব কারণেই এই কর্মসূচিকে শিশুস্বাস্থ্যের অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অভিভাবকরাও এখন দ্রুত ক্যাম্পেইন চালুর অপেক্ষায় রয়েছেন। কারণ দীর্ঘদিন ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় অনেক শিশু নির্ধারিত সময়ের ক্যাপসুল গ্রহণ করতে পারেনি। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সরবরাহ হাতে পাওয়ার পর সারা দেশে ব্যাপক প্রস্তুতির মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

স্বর্ণবাজারে বড় পতন

সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, ক্যাপসুল সরবরাহ দ্রুত নিশ্চিত হলে জুন মাসের শেষ সপ্তাহেই শিশুদের জন্য বহু প্রতীক্ষিত কর্মসূচি শুরু হবে। এতে কোটি কোটি শিশু আবারও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণের সুযোগ পাবে এবং দীর্ঘদিনের ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ অবস্থার অবসান ঘটবে।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Comment