ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নতুন বিতর্ক, কী বললেন তাহের?
দেশের অন্যতম বৃহৎ শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা, অতীতের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি ব্যাংকটির অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন।
এক বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া ইসলামী ব্যাংকের অর্থ উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পরিবর্তে বর্তমান সরকার ব্যাংকটির অবশিষ্ট সম্পদ ও অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাঁর দাবি, জনগণের আমানতের অর্থ সুরক্ষিত রাখার পরিবর্তে নতুন করে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনি সংকেত।
ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নতুন বিতর্ক, কী বললেন তাহের? ডা. তাহের বলেন, ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখ লাখ গ্রাহক তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগ এই ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করেছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিতর্কিত ঋণ বিতরণ, করপোরেট প্রভাব এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কারণে ব্যাংকটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই অতীতে সংঘটিত অনিয়ম ও অর্থ পাচারের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। যারা অবৈধভাবে দেশের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় এই নেতা অভিযোগ করেন, ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জবাবদিহিতার অভাব বিরাজ করছে। ফলে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে অনিয়ম করার সুযোগ পেয়েছে। তাঁর মতে, যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশও মনে করেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করতে হলে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের বিকল্প নেই। বিশেষ করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো বিষয়গুলোতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় আর্থিক খাতের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ডা. তাহের তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংকের পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে এবং জনগণের আমানতের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ব্যাংক খাতকে কেন্দ্র করে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি দেশের বাইরে চলে যাওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এতে একদিকে যেমন আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে চলমান বিতর্ক শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে জাতীয় স্বার্থে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।
সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকের অর্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি এখন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি অবশিষ্ট সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হতে পারে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
