রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার
মহাবিশ্বের বিশালতায় এমন কিছু দৃশ্য রয়েছে যা যুগ যুগ ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মুগ্ধ করে আসছে। এমনই এক সুপরিচিত মহাজাগতিক কাঠামো হলো ‘রিং নেবুলা’ বা ‘বলয় নীহারিকা’ (Messier 57)। ১৭৭৯ সালে ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানী চার্লস মেসিয়ার এটি আবিষ্কার করার পর থেকে কয়েক শতাব্দী ধরে এটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়েতে অবস্থিত এই নীহারিকাটির ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল ‘লোহার বার’ বা লোহার দণ্ডের মতো কাঠামো খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
বিস্ময়কর আবিষ্কার: ৩.৭ ট্রিলিয়ন মাইল লম্বা লোহার বার
স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উইলিয়াম হার্শেল টেলিস্কোপে স্থাপিত নতুন একটি যন্ত্র ‘WEAVE’ (WHT Enhanced Area Velocity Explorer) ব্যবহার করে এই অদ্ভুত গঠনটি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, নীহারিকাটির উপরিভাগে প্রায় ৩.৭ ট্রিলিয়ন মাইল (৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার) দীর্ঘ এক বিশাল আয়রন বা লোহার পরমাণুর মেঘ জমাট বেঁধে আছে। এই লোহার মেঘটি দেখতে অনেকটা সোজা একটি দণ্ড বা বারের মতো।
কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জ্যোতির্বিজ্ঞানী রজার ওয়েসন, যিনি এই গবেষণার প্রধান লেখক, বলেন, “দশক ধরে গবেষণার পর একটি পরিচিত মহাজাগতিক বস্তু থেকে এমন নতুন কোনো চমক পাওয়া সত্যিই রোমাঞ্চকর।” এটি প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের অতি পরিচিত অংশগুলোকেও যখন নতুন প্রযুক্তি দিয়ে দেখা হয়, তখন সেখানে লুকিয়ে থাকা অমীমাংসিত রহস্য বেরিয়ে আসে।
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার পৃথিবীর মতো কোনো গ্রহের ধ্বংসাবশেষ?
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো এই লোহার মেঘের উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীদের অনুমান। গবেষকদের মতে, এই বিপুল পরিমাণ লোহার ভর পৃথিবীর গলিত লোহার কেন্দ্রের (Core) ভরের সাথে তুলনীয়। তাঁদের ধারণা, নীহারিকাটির কেন্দ্রস্থলে থাকা মৃত নক্ষত্রটি যখন তার জীবনচক্রের শেষে বাইরের স্তরগুলো ছুড়ে দিচ্ছিল, তখন তার কক্ষপথে থাকা কোনো পাথুরে গ্রহ সম্ভবত বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল। সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহেরই অবশিষ্টাংশ হতে পারে এই লোহার বার।
যদি এই ধারণা সত্যি হয়, তবে এটি আমাদের সৌরজগতের ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ পূর্বাভাস। আজ থেকে বিলিয়ন বছর পর যখন আমাদের সূর্য তার জ্বালানি শেষ করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে, তখন পৃথিবী এবং অন্যান্য পাথুরে গ্রহগুলোকেও হয়তো একই পরিণতি ভোগ করতে হবে। সূর্যের উত্তাপে আমাদের পৃথিবী বাষ্পীভূত হয়ে মহাকাশে লোহার পরমাণুর মেঘ হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখন পর্যন্ত কেবল একটি জোরালো অনুমান বা ‘কনজেকচার’ মাত্র, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার কেন এটি বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে?
রিং নেবুলা বা মেসিয়ার ৫৭ পৃথিবী থেকে প্রায় ২,৬০০ আলোকবর্ষ দূরে ‘লাইরা’ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত। মহাজাগতিক সময়ের হিসেবে মাত্র ৪,০০০ বছর আগে এটি গঠিত হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের কাছে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম, কারণ সাধারণ বাইনোকুলার বা ছোট টেলিস্কোপ দিয়েও এটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যানেট ড্রিউ বলেন, “আমরা এই এলাকায় অন্য কোনো উপাদানের এমন দণ্ডাকার গঠন দেখতে পাইনি। এটি সত্যিই অদ্ভুত। এর গুরুত্ব এখানেই যে, আমাদের কাছে এই মুহূর্তে এর কোনো সহজ ব্যাখ্যা নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, পৃথিবীর সমান একটি গ্রহের লোহা দিয়ে এই বার তৈরি হওয়া সম্ভব, কিন্তু কেন সেটি এমন নির্দিষ্ট ‘বার’ আকৃতি ধারণ করল, তার কোনো যুৎসই কারণ এখনও মেলেনি।
Windows 11-এ কী কী সমস্যা হচ্ছে?
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার গঠন ও ভবিষ্যৎ গবেষণা
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার আসলে একটি মৃতপ্রায় নক্ষত্রের অবশিষ্টাংশ। সূর্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভরের একটি নক্ষত্র যখন তার কেন্দ্রস্থলের পারমাণবিক জ্বালানি শেষ করে ফেলে, তখন সেটি একটি ‘লাল দানব’ (Red Giant) নক্ষত্রে পরিণত হয়। এরপর নক্ষত্রটি তার বাইরের গ্যাস ও ধুলোর স্তরগুলো মহাকাশে ছুড়ে দেয়। অবশিষ্ট অংশটি সংকুচিত হয়ে একটি ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ বা শ্বেত বামন নক্ষত্রে পরিণত হয়, যা আকারে অনেকটা পৃথিবীর সমান।
পৃথিবী থেকে দেখতে এটি একটি বলয় বা রিংয়ের মতো মনে হলেও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন এটি আসলে একটি সিলিন্ডারের মতো আকৃতি, যা আমরা ওপর থেকে দেখছি। এর অধিকাংশ এলাকা হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসে পূর্ণ হলেও এতে সামান্য পরিমাণে ভারী উপাদান থাকে।
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার বর্তমানে আমাদের ছায়াপথে এমন প্রায় ৩,০০০টি নীহারিকা জানা রয়েছে। এগুলো নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের জীবনচক্র এবং মহাকাশে রাসায়নিক উপাদানের চক্রাকার আবর্তন সম্পর্কে জানতে পারেন। রজার ওয়েসন এবং তাঁর দল আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে আরও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই রহস্যময় লোহার বারের উৎস এবং এর গঠনের পেছনের প্রকৃত কারণ উন্মোচন করা সম্ভব হবে।
রিং নেবুলার রহস্যময় লোহার বার এই আবিষ্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি মৃত্যু আসলে নতুন কিছু সৃষ্টির ভিত্তি। একটি গ্রহের ধ্বংস হয়তো মহাকাশে নতুন কোনো উপাদান ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে নতুন নক্ষত্র বা গ্রহ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে কাজ করবে। তবে সেই ধ্বংসলীলার মাঝে যে লোহার বারের মতো অদ্ভুত শিল্পকর্ম তৈরি হতে পারে, তা বিজ্ঞানীদের কল্পনারও অতীত ছিল। Monthly Notices of the Royal Astronomical Society সাময়িকীতে এই গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে।
